বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬

| ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২

ঢাকা চেম্বারের সেমিনার

বেসরকারিখাতের অগ্রগতি তেমন আশাব্যঞ্জক নয়

টেকস্ক্রল নেটওয়ার্ক

প্রকাশ: ১৫:২৬, ১১ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৫:২৮, ১১ মার্চ ২০২৬

বেসরকারিখাতের অগ্রগতি তেমন আশাব্যঞ্জক নয়

ডিসিসিআইয়ের বেসরকারিখাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা শীর্ষক সেমিনারে অনুষ্ঠিত হয়

সম্প্রতি শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে সৃষ্টি অচলাবস্থা, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নতুন শুল্কারোপ, অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, শিল্পখাতে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিয়তা, স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগে স্থবিরতাসহ বিভিন্ন কারণে দেশের বেসরকারিখাতের অগ্রগতি তেমন আশাব্যঞ্জক নয় বলে মনে করেন, ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। ৯ মার্চ, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত বেসরকারিখাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ অভিমত জানান।

ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনের এ সেমিনারে মূল প্রবন্ধে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, মার্কিন প্রশাসনের নতুন শুল্ক নীতি স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব আসতে পারে। দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় এলডিসি উত্তরণ আরো ৩ বছর পিছিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পাশাপাশি খাতভিত্তিক পরিকল্পনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের উপর তিনি জোরা দেন। সেই সাথে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অটোমেশন, প্রত্যক্ষ করের উপর গুরুত্বারোপের মাধ্যমে আওতা বৃদ্ধি, দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থার হতে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবনতা হ্রাস ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজন।

তিনি আরো বলেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি সহনীয় করতে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রত্যহার, সুদহার হ্রাস, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, সাপ্লাইচেইন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা সুদৃঢ়করণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার কোন বিকল্প নেই। এছাড়াও স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগে গতি আনায়নের লক্ষ্যে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় হ্রাসে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত নিশ্চিতকরণ ও সর্বোপরি আইন-শৃঙ্খলা পরিবেশ উন্নয়ন একান্ত অপরিহার্য বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন। টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্প-কারখানায় নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি পরিকল্পনা প্রণয়ন, অনশোর ও অফশোর অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরাদারের আহ্বান জানান তাসকীন আহমেদ।       

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোঃ জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় সরকার সচেতন এবং এ অভিঘাত মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন,  দেশের উন্নয়নের সুফল যেন প্রতিটি মানুষ পেতে পারে সেটার উপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি জানান, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি দক্ষজনবল তৈরিতে সরকার প্রাধান্য দিবে।

তিনি আরো বলেন, করজাল সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও আমরা ততটা মনোযোগী নই, ফলে আমাদের স্থানীয় ও বৈশ্বিক ঋণের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে, এ অবস্থা নিরসনে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন,  আয় ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সহায়তা প্রদানের কাজ করছে নতুন সরকার, যা প্রশংসার দাবী রাখে। তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে   ১ ট্রিলিয়ন ডলারের উন্নীতকরণের সরকারের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করতে হলে সবার আগে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। এক্ষেত্রে উৎপাদানশীল খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং বিশেষকরে এসএমইদের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হলে নতুন পদ্ধতি ও পন্থা নিশ্চিত করতে হবে, শুধুমাত্র ব্যাংক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করলে সুফল পাওয়া যাবে না, এছাড়াও এসএমইদের টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে বৃহৎ শিল্পের চাকাকেও গতিশীল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সার্বিকভাবে একটি বিনিয়োগ বান্ধব পরিস্থিতির জন্য উচ্চ সুদ হার কোন ভাবেই কাম্য নয়।

এসএসজিপি-এর অতিরিক্ত সচিব এ. এইচ. এম. জাহাঙ্গীর বলেন, এলডিসিভুক্ত থাকায় বাংলাদেশ এতদিন শুল্ক মুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছিল এবং চলতি বছর এলডিসি উত্তরণের সিদ্ধান্ত থাকলেও গতমাসের ১৮ তারিখে এলডিসি উত্তরণের সময় সীমা আারো ৩বছর পিছিয়ে নেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাওয়ার আশা করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন বলেন, মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে ৯-এ রয়েছে, তবে  সম্প্রতি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুকোচনমুখী মুদ্রানীতি নিতে হবে, তা না হলে মুদ্রাস্ফীতি আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ ও সুদের হার হঠাৎ করে হ্রাস করলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, সরকারকে আয়ের জন্য শুল্কের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা কমাতে হবে এবং সেই সাথে স্থানীয় শিল্প সুরুক্ষার বিষয়টিও একটি নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ও যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন। এনবিআরের কর কাঠমোর আমূল সংষ্কারের উপর তিনি জোরারোপ করেন, সেই সাথে পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল কার্যক্রমের আওয়া নিয়ে আসতে হবে, অভিমত জ্ঞাপন করেন, যদিও এটি বাস্তবায়নে প্রচুর প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং বেসরকারিখাতকে সরকারের উপর চাপ প্রয়োগে উদ্যোগী হতে হবে।  

বিআইডএস’র মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, দেশের কৃষি খাতে দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণ দিকে ধাবিত হচেছ, ফলে বিশেষকরে চাল উৎপাদন লাভজনক না হওয়ায় কৃষকের হতাশা হচ্ছে, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে চাল উৎপদান হ্রাস পেতে পারে, এছাড়াও বাজারের সাপ্লাইচেইন ব্যবস্থাপনাও কার্যকর নয়, এ বিষয়গুলো সচেতনভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো অর্থায়ন, যা মোকাবেলায় ব্যাংকখাতকে সংষ্কারের মাধ্যমে আরো উদ্যোগী হতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি প্রাপ্তিতে ব্যক্তি ও শিল্প পর্যায়ে হতাশা ও শংকা রয়েছে জানিয়ে তিনি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর পরামর্শ প্রদান করেন।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, আমাদের সবকিছু ঠিকমত চলছে না এবং এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে উদ্যোগী হতে হবে, সেই সাথে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের আস্থা আছে কিনা তা নির্ধারণে মাধ্যমে, সেটা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হতে হবে। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে বাজেট, মুদ্রানীতি ও সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনার উপর জোর দিতে হবে। রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির অন্যান্য কোন খাতে আমরা স্বস্তিতে নেই, এখানে স্বস্তির পরিবেশ নিশ্চিতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। করহার বাড়ানোর জন্য করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি সমগ্র রাজস্ব কাঠামোকে অটোমেশনের আওয়া নিয়ে আসার উপর তিনি জোরারোপ করেন। রাজস্ব ঘাটতি কমাতে বাস্তবভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা জরুরী বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি জানান, চামড়া খাতে ৫-১০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় সম্ভব, তবে এক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি, যা নিশ্চিতে সরকারকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।     

বিজিএমইএ’র পরিচালক ও সুরমা গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, তৈরি পোষাক খাত আমাদের অর্থনীতির অন্যতম হাতিয়ার এবং ২০০৬ সালে এখাতের বৈশ্বিক অবস্থান ৮ম হলেও বর্তমানে আমরা ২য় স্থানে করছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র সহ ইইউতে আমাদের পণ্যের বাজার বেশ যুকিপূর্ণ, কারণ ঐ অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে আমাদের এফটিএও নেই, এ বিষয়ে জরুরী ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও ব্যাংক ঋণের সুদের হার অনেক বেশি হওয়ার কারণে দেশের উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়ছে, তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের জিটিএফ ফান্ডের সঠিক ব্যবহার জরুরী বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।    

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক রিডিং বিশ্বববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম রিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, ব্যবসা পরিচালন ব্যয় হ্রাসে সরকারের পক্ষ হতে উদ্ভাবনী নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরী। এছাড়াও মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন শিক্ষাক্রমের সকল স্তরের যুগোপযোগীকরণ এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত সনদের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্য নিশ্চিতের কোন বিকল্প নেই বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন।  

সূত্র: সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

এ সম্পর্কিত খবর
আরও পড়ুন