২০২৪ সালে পর সংগঠনটির কার্যক্রম নেই
কোথায় হারিয়ে গেল ই-ক্যাব?
মহিউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ১৬:২১, ১৫ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৩৯, ১৫ জুন ২০২৬
কোথায় হারিয়ে গেল ই-ক্যাব?
এক সময় ই-ক্যাব ছিল প্রভাবশালী সংগঠন
বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতের উত্থানের ইতিহাস লিখতে গেলে একটি নাম বারবার সামনে আসে, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ই-ক্যাব। এক সময় এই সংগঠনটি ছিল দেশের ই-কমার্স খাতের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্ম। নীতিনির্ধারণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রসার, ভোক্তা অধিকার এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ই-ক্যাবের ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সংগঠনটির কার্যক্রম যেন জনসমক্ষে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, কোথায় হারিয়ে গেল ই-ক্যাব?
এক সময় ই-ক্যাব ছিল সংবাদমাধ্যমের নিয়মিত আলোচনার বিষয়। ই-কমার্স সংক্রান্ত যেকোনো সংকট, নতুন নীতি, উদ্যোক্তা সমস্যা কিংবা ভোক্তা অভিযোগে সংগঠনটির নেতারা গণমাধ্যমে বক্তব্য দিতেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অস্থিরতার সময়ও ই-ক্যাব দাবি করেছিল, ইন্টারনেট বন্ধ ও সহিংসতার কারণে দেশের ই-কমার্স খাতে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং সরকারকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ই-ক্যাবের নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ছিল। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে সংগঠনটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ ঘিরে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, সংগঠনটি ক্রমশ স্বাধীন ব্যবসায়ী সংগঠনের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাবের বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে।
বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিংসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কেলেঙ্কারির মাধ্যমে। হাজার হাজার গ্রাহক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা হারান। পরবর্তীতে ই-ক্যাব এসব প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ স্থগিত করলেও প্রশ্ন থেকে যায়, এত বড় অনিয়ম চলাকালে সংগঠনটি কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল? সদস্যপদ বাতিল করেও কি এসব প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ নজরদারিতে রাখা সম্ভব হয়েছিল?
ই-ক্যাব দাবি করেছিল, তারা অনেক আগেই ইভ্যালির অনিয়ম সম্পর্কে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সতর্ক করেছিল। সংগঠনের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকও প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ২০১৯ সালেই সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু ভুক্তভোগী গ্রাহকদের প্রশ্ন হলো, যদি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে কেন বাজারে প্রতারণামূলক ব্যবসা এত বড় আকার ধারণ করল? কেন গ্রাহকদের আস্থা রক্ষায় আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া হলো না?
আজ ২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, ই-ক্যাবের নাম আগের মতো সংবাদ শিরোনামে নেই। ডিজিটাল বাণিজ্য খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও সংগঠনটির দৃশ্যমান কার্যক্রম সীমিত। নতুন উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন, তাদের অনেক সমস্যার বিষয়ে সংগঠনের সক্রিয় অবস্থান চোখে পড়ে না। অন্যদিকে সাধারণ গ্রাহকদের একটি বড় অংশ এখনও ই-কমার্সকে সন্দেহের চোখে দেখে। সাম্প্রতিক অনলাইন আলোচনাগুলোতেও প্রতারণার স্মৃতি এবং আস্থার সংকটের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে।
প্রশ্ন হলো, ই-ক্যাব কি শুধুই একটি নেতৃত্বনির্ভর সংগঠন ছিল, নাকি এটি সত্যিকার অর্থে সদস্যভিত্তিক একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি? একটি সংগঠনের শক্তি তার ভবন, লোগো বা পদাধিকারীদের মধ্যে নয়; শক্তি নিহিত থাকে সদস্যদের আস্থা ও অংশগ্রহণে। সেই আস্থার জায়গাটিই হয়তো সময়ের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মেটার এআই হ্যাকাথনের ঘোষণায় কর্মীদের অসন্তোষ
বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত এখনও সম্ভাবনাময়। তরুণ উদ্যোক্তা, ডিজিটাল পেমেন্ট, লজিস্টিকস এবং প্রযুক্তির বিকাশ এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবসায়ী সংগঠন, যা সরকারের প্রশংসা নয়, বরং উদ্যোক্তা ও ভোক্তাদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখবে।
ই-ক্যাবের বর্তমান নীরবতা তাই শুধু একটি সংগঠনের অনুপস্থিতি নয়; এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল বাণিজ্য খাতের নেতৃত্ব সংকটেরও প্রতীক। আজ সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। ই-ক্যাব যদি সত্যিই আবার প্রাসঙ্গিক হতে চায়, তবে তাকে বিতর্কের অতীত থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ভোক্তা আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে।
অন্যথায় ইতিহাস হয়তো একদিন প্রশ্ন করবে, বাংলাদেশের ই-কমার্সের একসময়ের আলোচিত সংগঠনটি কোথায় হারিয়ে গেল?













