সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষণা
বিশ্বের প্রথম পোশাকের সাথে যুক্ত টাচস্ক্রিন বানালেন গবেষকরা
টেক স্ক্রল
প্রকাশ: ০০:২৭, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
স্মার্টফোনের স্ক্রিন যদি আর হাতে ধরে রাখতে না হয়, বরং জামার হাতাই যদি টাচস্ক্রিন হিসেবে কাজ করে তাহলে কেমন হবে? এমন সম্ভাবনারই বাস্তব রূপ দেখিয়েছেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের গবেষকেরা। তারা এমন এক ফাইবার তৈরি করেছেন, যা একই সঙ্গে ডিসপ্লে হিসেবে কাজ করতে পারে এবং স্পর্শ শনাক্ত করতে পারে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা পোশাকের হাতায় একটি কার্যকর টাচস্ক্রিন তৈরিও করেছেন।
গবেষকদের দাবি, পোশাকে সরাসরি বোনা টাচস্ক্রিন, এটিই বিশ্বে প্রথম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এতে প্রচলিত ফোন বা ল্যাপটপের মতো কোনো শক্ত ও ভারী স্ক্রিন প্যানেল ব্যবহার করা হয়নি। বিশেষ ইলেকট্রনিক ফাইবার দিয়েই তৈরি করা হয়েছে পুরো ডিসপ্লে ব্যবস্থা।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের কলেজ অব ডিজাইন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহকারী অধ্যাপক তুরাল খুদিয়েভের নেতৃত্বে এই গবেষণা হয়েছে।
এক মিলিমিটার পুরু ফাইবারে হাজারো চিপ
এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো বিশেষভাবে তৈরি ইলেকট্রনিক ফাইবার। গবেষকেরা ক্ষুদ্র, ইনসুলেটেড তারের নির্দিষ্ট জায়গায় মাইক্রোচিপ সংযোগের জন্য বিশেষ পদ্ধতি তৈরি করেছেন। লেজারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংযোগস্থল তৈরি করার পর সেখানে গলিত সোল্ডার ব্যবহার করে চিপগুলো যুক্ত করা হয়। এই পদ্ধতিতে একটি ফাইবারে ৫ হাজারের বেশি চিপ এবং ২০ হাজারের বেশি বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।
এসব ইলেকট্রনিক উপাদানকে থার্মাল ড্রয়িং প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন একটি ফাইবারের মধ্যে যুক্ত করা হয়, যার পুরুত্ব প্রায় এক মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে।
ফাইবারের ভেতরে থাকা একটি স্তর, স্পর্শ শনাক্ত করতে পারে। ব্যবহারকারী ফাইবারের ওপর আঙুল রাখলে বৈদ্যুতিক সার্কিট সম্পূর্ণ হয় এবং সিস্টেম বুঝতে পারে ঠিক কোন জায়গায় স্পর্শ করা হয়েছে। এরপর সেই জায়গার কাছের পিক্সেল জ্বলে ওঠে।
হাতায় ৯৬ বাই ৫৪ পিক্সেলের ডিসপ্লে
গবেষকদের তৈরি প্রোটোটাইপে ৫৪টি বিশেষ পিক্সেল ফাইবার পোশাকের হাতার সামনের অংশে বসানো হয়েছে। প্রতিটি ফাইবারে রয়েছে ৯৬টি এলইডি। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ৯৬ বাই ৫৪ পিক্সেলের একটি ডিসপ্লে। এর আকার ১৬৮ মিলিমিটার বাই ১০৫ মিলিমিটার। এটি প্রতি সেকেন্ডে ৩০ ফ্রেম পর্যন্ত প্রদর্শন করতে পারে এবং ৮ বিট রঙ ব্যবহার করে।
শুধু ছবি দেখানো নয়, এই পোশাকের মাধ্যমে বেশ কিছু কাজও করা যায়। গবেষকেরা এতে ক্যালকুলেটর চালানো, ছবি দেখানো, ভিডিও চালানো, কম্পাস হিসেবে কাজ করা এবং ভয়েস কমান্ড গ্রহণের ব্যবস্থা দেখিয়েছেন। ব্লুটুথের মাধ্যমে অন্য ডিভাইস থেকে ছবিও গ্রহণ করতে পারে এই ফাইবারভিত্তিক ডিসপ্লে। এমনকি প্রয়োজন অনুযায়ী স্ক্রিনের দিক পরিবর্তন এবং আশপাশের আলোর মাত্রা অনুযায়ী উজ্জ্বলতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
পোশাকের মতোই নমনীয় ও ধোয়া যায়
পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো ইলেকট্রনিক্সযুক্ত পোশাক কি নিয়মিত ব্যবহার ও ধোয়ার পরও কাজ করবে? গবেষকদের পরীক্ষায় প্রোটোটাইপটি সাধারণ ওয়াশিং মেশিনে ডিটারজেন্ট দিয়ে ৫০ বার ধোয়ার পরও আলো ও স্পর্শ শনাক্ত করার সক্ষমতা প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। একইভাবে ৫ মিলিমিটার ব্যাসার্ধে ১ হাজার বার বাঁকানোর পরও এর কার্যকারিতায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ডিসপ্লেটি তুলা, পলিয়েস্টার ও ডেনিমের মতো প্রচলিত কাপড়ের কাছাকাছি মাত্রায় বাতাস চলাচলের সুযোগ দেয়। ত্বকের সংস্পর্শের ক্ষেত্রেও এটি নির্ধারিত নিরাপত্তা সীমার মধ্যে রয়েছে।
শরীরের তাপমাত্রাও দেখাবে পোশাক
এই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একই ফাইবারভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে বিভিন্ন সেন্সর যুক্ত করা যায়। গবেষকেরা প্রোটোটাইপে মাইক্রোফোন, স্পিকার এবং নড়াচড়া শনাক্তকারী সেন্সর যুক্ত করেছেন। পাশাপাশি চৌম্বকীয় উত্তর দিক শনাক্ত করা, তাপমাত্রা মাপা এবং আশপাশের আলোর মাত্রা পরিমাপের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
হাতার নিচের অংশে তাপমাত্রা শনাক্তকারী ফাইবার ব্যবহার করলে পোশাকটি শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করে সেটি ডিসপ্লেতেই দেখাতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবায় বড় সম্ভাবনা
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হতে পারে স্বাস্থ্যসেবায়। ভবিষ্যতে পোশাকের মধ্যেই বিভিন্ন সেন্সর যুক্ত করে ব্যবহারকারীর শারীরিক বিভিন্ন তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে। সেই তথ্য পোশাকের ডিসপ্লেতেই দেখা যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হলে ব্যক্তিভেদে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ, সতর্কতা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া দেয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সামনে আরও উন্নত প্রযুক্তির লক্ষ্য
গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো এই প্রযুক্তির ডিসপ্লের রেজল্যুশন বাড়ানো এবং একই ফাইবারে আরও উন্নত সেন্সর ও অন-ডিভাইস এআই যুক্ত করা। এতে ডিসপ্লে, টাচ সেন্সর, বিভিন্ন ধরনের সেন্সর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একই টেক্সটাইল প্ল্যাটফর্মে একত্রিত হতে পারে।
গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ফাইবারকে প্রচলিত শিল্পকারখানার যন্ত্র ব্যবহার করে বোনা, এমব্রয়ডারি করা বা কাপড়ে সংযুক্ত করা সম্ভব হবে। ফলে স্মার্টফোন বা স্মার্টওয়াচের বাইরে পোশাকই হয়ে উঠতে পারে মানুষ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির নতুন ইন্টারফেস।













