রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

| ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

আর্থিক সংকটে থমকে প্রচারণা

জটিল কাজে ব্যবহারে দেশে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন রোবট

গাজী তানজীর আহমেদ

প্রকাশ: ১৭:১৩, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৮:৪৩, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জটিল কাজে ব্যবহারে দেশে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন রোবট

জটিল কাজে ব্যবহারে দেশে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন রোবট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবোটিক্স ঘিরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। সেই প্রযুক্তির দৌড়ে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। দেশের গবেষক ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে তৈরি হচ্ছে পানির নিচে চলাচলকারী রোবট, দুর্গম এলাকায় তথ্য সংগ্রহের যন্ত্র এবং মোবাইল ফোনে ছবি তুলে ফসলের রোগ শনাক্ত করার এআইভিত্তিক অ্যাপ।

তবে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সফলতা মিললেও এসব উদ্ভাবনকে বাজারজাত উপযোগী করে তুলতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থের সংকট। পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে গবেষণার পরবর্তী ধাপ, পণ্য উন্নয়ন ও প্রচারণার কাজ অনেক ক্ষেত্রেই থেমে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সিফাত ই. আরমান টেকস্ক্রল নিউজকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে বিভিন্ন প্রয়োজনে রোবট ও এআই প্রযুক্তি তৈরির কাজ চলছে। এর একটি বড় অংশ হচ্ছে ‘বায়ো-ইনস্পায়ার্ড রোবোটিক্স’ অর্থাৎ প্রাণীর চলাফেরা, গঠন ও আচরণ থেকে ধারণা নিয়ে রোবট তৈরি।

এরই উদাহরণ টার্টলবট। সামুদ্রিক কচ্ছপের চলাচল থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি এই আন্ডারওয়াটার রোবট পানির নিচে চলাচল, ভিডিও ধারণ ও অনুসন্ধানের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত রোবোট্রনিক্স ফেস্টে প্রজেক্ট শোকেস প্রতিযোগিতায় টার্টলবট প্রথম স্থান অর্জন করে।

শুধু পানির নিচেই নয়, দুর্গম ও রুক্ষ এলাকায় চলাচল এবং তথ্য সংগ্রহের জন্যও তৈরি হয়েছে রোবট। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে তৈরি ডেসিপিড নামের ছোট রোবটটি সেন্টিপেড ও মিলিপেডের চলাচল থেকে অনুপ্রাণিত।

রোবটটির প্রতিটি অংশ বাধার সঙ্গে স্বাধীনভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। আবার সবগুলো অংশ সমন্বিতভাবে ঢেউয়ের মতো চলাচল করতে সক্ষম। ফলে দুর্গম ও অসমতল এলাকায় তথ্য সংগ্রহের কাজে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

২০২৫ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইনভেনশন ক্রিয়েটিভিটি এক্সপোতে ডেসিপিড রোবটটি সিলভার মেডেল অর্জন করে। একই বছর তুরস্কের গ্লোবাল রোবোটিক্স অ্যান্ড ইনোভেশন চ্যালেঞ্জে এটি চতুর্থ স্থান অর্জন করে।

রোবোটিক্সের পাশাপাশি কৃষিতেও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এগ্রোসিডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাফায়াত সিদ্ধি টেকস্ক্রল নিউজকে জানান, মোবাইল ফোনে গাছের পাতার ছবি তুলে ফসলের রোগ শনাক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে সুগারকেনএআই অ্যাপ।

অ্যাপটি আখের পাতার ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ রোগ শনাক্ত করতে সক্ষম বলে জানান তিনি। গবেষক সিফাত ই. আরমানের গবেষণা-প্রোফাইলেও সুগারকেনএআইকে মোবাইলভিত্তিক আখের রোগ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্ভিদের রোগ শনাক্তকরণে এআইয়ের সক্ষমতা বাড়াতেও গবেষণা চলছে। এর অংশ হিসেবে তৈরি হয়েছে ‘প্ল্যান্টইনকোয়ারিভিকিউএ’ নামে একটি বেঞ্চমার্ক, যেখানে উদ্ভিদের ছবি ও প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে রোগ নির্ণয়, রোগের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অবস্থা এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে এআই মডেলের সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে।

প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ‘প্ল্যান্টইনকোয়ারিভিকিউএ’-তে প্রায় ২৫ হাজার বিশেষজ্ঞ-পর্যালোচিত উদ্ভিদের ছবি এবং ১ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি প্রশ্নোত্তর রয়েছে। এতে ‘চেইন অব ইনকুয়েরি’ কাঠামো ব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি রোগের অগ্রগতি ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গবেষণাটি এসিএল ২০২৬ ফাইন্ডিংশ -এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষক ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, পরীক্ষামূলকভাবে রোবট বা প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব হলেও সেটিকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপ দিতে গিয়ে বড় ধরনের অর্থের প্রয়োজন হয়।

তাদের মতে, সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রকল্পে প্রাথমিক অর্থ বা সিড মানি দিয়ে থাকে। তবে সেই অর্থে একটি প্রযুক্তির প্রাথমিক সংস্করণ তৈরি করা সম্ভব হলেও পরবর্তী সময়ে সেটিকে বাজারজাত উপযোগী করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং প্রচারণা চালানোর মতো কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এর অন্যতম কারণ কাঁচামালের জন্য আমদানিনির্ভরতা। রোবট তৈরির বিভিন্ন উপকরণ বিদেশ থেকে আনতে হয়, যা ব্যয়বহুল। পরীক্ষামূলকভাবে একটি রোবট তৈরি করার পর সেটির উন্নত সংস্করণ, একাধিক ইউনিট উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণের জন্য আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।

একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির প্রচারণার জন্যও অর্থ দরকার। ফলে অর্থের সীমাবদ্ধতায় সম্ভাবনাময় অনেক প্রযুক্তিই গবেষণাগারের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব ব্যবহারে যেতে পারছে না।

সিফাত ই. আরমান বলেন, এসব রোবট ও প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা সম্ভব হলে দেশে প্রযুক্তিপণ্য তৈরির বড় সম্ভাবনা তৈরি হবে। দেশের বিভিন্ন খাতে ব্যবহারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এসব প্রযুক্তি বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এখন থেকেই এ খাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এর জন্য গবেষণা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, রোবোটিক্স গবেষণা ও দেশীয় প্রযুক্তি তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে বাংলাদেশ শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, ধীরে ধীরে প্রযুক্তির উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

আরও পড়ুন