সাইবার অপরাধ
এসএমএস পাঠানোর আগেই গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করেন হ্যাকাররা
আইরিন
প্রকাশ: ১২:৩১, ৩০ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৭:০৬, ৩০ আগস্ট ২০২৬
এসএমএস পাঠানোর আগেই গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করেন হ্যাকাররা
দেশে বাড়ছে স্প্যাম এসএমএসের মাধ্যমে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা। বিভিন্ন পুরস্কার, অফার কিংবা আর্থিক সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে মোবাইল গ্রাহকদের কাছে পাঠানো হচ্ছে এসব ক্ষুদে বার্তা। অনেক ক্ষেত্রে এসএমএসে থাকা লিংকে ক্লিক করার পরই বিপদে পড়ছেন গ্রাহকরা। হারাচ্ছেন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে থাকা বড় অঙ্কের অর্থ।
তবে এসব প্রতারণামূলক এসএমএস হঠাৎ করেই পাঠানো হয় না। এসএমএস পাঠানোর আগেই অনলাইনে গ্রাহকদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন হ্যাকাররা বলে জানিয়েছেন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ। পরে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্রাহকের আগ্রহ ও পছন্দ অনুযায়ী তৈরি করা হয় প্রতারণামূলক বার্তা।
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে সাইবার অপরাধের ধরনও বদলাচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি এখন মোবাইল নম্বরে সরাসরি স্প্যাম এসএমএস পাঠিয়েও সক্রিয় রয়েছে প্রতারক চক্র। অর্থের লোভ দেখানো এসব বার্তা এখন প্রায় নিয়মিতই পাচ্ছেন মোবাইল গ্রাহকরা।
সম্প্রতি এমন প্রতারণার শিকার হন গণমাধ্যমকর্মী নীলা ইসলাম (ছদ্মনাম)। জানা যায়, কয়েক দিন আগে তার স্বামীর মোবাইল নম্বরে একটি এসএমএস আসে। বার্তাটিতে থাকা একটি লিংকে ক্লিক করার পরই মোবাইল ফোনটি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। একপর্যায়ে সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। পরদিন তারা জানতে পারেন, অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থ।
সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ টেকস্ক্রলকে জানান, প্রতিদিন সেন্টারে ১০ থেকে ১৫টি সাইবার অপরাধের অভিযোগ আসে। এর মধ্যে এসএমএসের মাধ্যমে প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উল্লেখযোগ্য।
তিনি জানান, রাজধানীর ৫০টি থানায় বর্তমানে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত প্রায় ৪৫০টি মামলা চলমান রয়েছে। এসব মামলা ও অভিযোগের মধ্যে এসএমএসের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনাও রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়।
সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, এই চক্রের কার্যক্রম চীন থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু মানুষও জড়িত। ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে গ্রাহকদের তথ্য সংগ্রহ করে প্রায় ১২০টি সিম ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে প্রতারণামূলক কার্যক্রম।
তিনি আরও জানান, এসএমএস পাঠানোর আগে অনলাইনে গ্রাহকদের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে গ্রাহকের পছন্দের পণ্য বা সেবার অফার, পুরস্কার কিংবা নানা ধরনের আর্থিক সুবিধার কথা উল্লেখ করে পাঠানো হয় প্রতারণামূলক বার্তা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রতি মাসেই সাইবার অপরাধে জড়িত বেশ কয়েকজনকে আটক করা হচ্ছে। তবে চক্রটির মূল হোতারা চীনে অবস্থান করায় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
প্রযুক্তি বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা টেকস্ক্রলকে বলেন, সাইবার অপরাধের অনেক মামলা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় পড়ে থাকায় একপর্যায়ে ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ নষ্ট বা অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে অপরাধীদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, সাইবার অপরাধের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ ও অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তানভীর হাসান জোহা আরও বলেন, ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা-২০২৬ বাস্তবায়িত হলে বিদেশে অবস্থানরত সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। অপরাধীদের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশকে সরবরাহ করা গেলে তাদের নিজ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও আইনগত সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তার মতে, বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থানরত চীনসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মধ্যেও কেউ কেউ সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তাই যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অপরাধে জড়িত বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে দেশে বাড়তে থাকা সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একটি পৃথক ও শক্তিশালী সাইবার অপরাধ কমিশন গঠনেরও পরামর্শ দেন এই প্রযুক্তি বিশ্লেষক।













