কম্পিউটার হ্যাকারের গল্প
ফুটবল খেলার গোপন তথ্য ফাঁস করেছেন পর্তুগিজ হ্যাকার
টেকস্ক্রল নেটওয়ার্ক
প্রকাশ: ১৭:০৯, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফুটবল খেলার গোপন তথ্য ফাঁস করেছেন পর্তুগিজ হ্যাকার
ফুটবল বিশ্বের গোপন তথ্য ফাঁস করে আলোচনায় আসে পর্তুগিজ হ্যাকার রুই পিন্টো। তার তৈরি ‘ফুটবল লিকস’ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গোপন নথি ও ই-মেইল বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করে। এর মধ্যে ছিল ম্যানচেস্টার সিটির স্পনসরশিপ চুক্তি ও অর্থ পরিশোধ সংক্রান্ত তথ্য।
৩৭ বছর বয়সী পিন্টোর ফাঁস করা তথ্যের সূত্র ধরে ইউরোপীয় ফুটবলের নানা আর্থিক কর্মকাণ্ড সামনে আসে। ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধেও আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। শুক্রবার প্রিমিয়ার লিগের ১১৫টি অভিযোগের অধিকাংশে দায়ি করা হয়েছে ক্লাবটিকে।
তবে পিন্টোকে ঘিরে মতভেদও তীব্র। কারও কাছে তিনি তথ্য চুরি করা একজন অপরাধী হ্যাকার। আবার কেউ মনে করেন, ফুটবলের আড়ালে থাকা অনিয়ম সামনে এনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
২০১৫ সালে ‘ফুটবল লিকস’ চালু করেন পিন্টো। তার উদ্দেশ্য ছিল ফুটবলের ‘গোপন দিক’ সামনে আনা। তখন তিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখে ‘জন’ নামে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।
পর্তুগালের ক্রীড়া দৈনিক রেকর্ড এর সাংবাদিক আন্তোনিও ভারেলা ছিলেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রথম সাংবাদিকদের একজন। পিন্টোর কাছ থেকে পাওয়া নথি দেখে তিনি বুঝতে পারেন, এগুলো ফুটবল বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
শুরুতে ফুটবল লিকসের তথ্যের মধ্যে পর্তুগালের বেনফিকা ও পিন্টোর সমর্থন করা এফসি পোর্তোর বিষয়ও ছিল। পরে বিশ্বের বড় বড় ক্লাব, খেলোয়াড় ও এজেন্টদের নানা তথ্য সামনে নিয়ে আসে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি ও নেইমারের মতো তারকাদের নিয়েও নথি প্রকাশ করা হয়।
পরে জার্মান সাময়িকী ডের স্পিগেলের সাংবাদিক রাফায়েল বুশম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন পিন্টো। বিশ্বাস তৈরি হওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের হাতে বিপুল পরিমাণ নথি তুলে দেন।
ডের স্পিগেলের সাংবাদিকদের একটি দল সেসব নথি যাচাই করে। তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে তারা সফটওয়্যার ব্যবহার করেন এবং বিভিন্ন নথির মধ্যে মিল খুঁজে দেখেন। পিন্টো মোট ৩ টেরাবাইটের বেশি তথ্য দেন বলে জানিয়েছে বিবিসি। এই পরিমাণ তথ্য প্রায় ৩ হাজার এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সমান।
পর্তুগালের ভিলা নোভা দে গাইয়া এলাকায় বড় হয়েছেন পিন্টো। তার সাবেক ভূগোল শিক্ষক মারিও ফালকাওয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলায় পিন্টো ছিলেন স্বাভাবিক ও সামাজিক স্বভাবের ছাত্র। তবে কম্পিউটারে তিনি বেশ দক্ষ ছিলেন।
পিন্টোর মা মারা যান যখন তার বয়স ১১ বছর। তার বাবা জুতার কারখানায় কাজ করতেন। পরে পুরোনো জিনিসের ব্যবসা করতেন। তার সাবেক শিক্ষক বলেন, পিন্টোর এমন কর্মকাণ্ডে তারা বিস্মিত হয়েছিলেন।
২০১৯ সালে হাঙ্গেরিতে গ্রেপ্তার হন পিন্টো। পরে তাকে পর্তুগালে পাঠানো হয়। বিভিন্ন সময়ে তাকে কারাগারে একাকী বন্দিত্ব, গৃহবন্দিত্ব এবং সাক্ষী সুরক্ষা কর্মসূচির মধ্যে থাকতে হয়েছে।
২০২৩ সালে প্রথম মামলায় তিনি তথ্য ব্যবস্থায় অবৈধ প্রবেশ, চিঠিপত্রের গোপনীয়তা ভঙ্গ এবং অর্থ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। তাকে চার বছরের স্থগিত কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফ্রান্সের একটি আলাদা মামলায়ও তিনি ছয় মাসের স্থগিত কারাদণ্ড পান।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লিসবনে তার আরেকটি বিচার শুরু হয়। নিরাপত্তার কারণে আদালতে তার ঠিকানাও প্রকাশ করা হয়নি। মামলার সময় তার সঙ্গে সাক্ষী সুরক্ষা দলের সদস্যরা ছিলেন।
পিন্টোকে নিয়ে ইউরোপে দুই ধরনের মত রয়েছে। সাবেক পর্তুগিজ রাজনীতিক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য আনা গোমেস মনে করেন, তাকে শাস্তি দেওয়ার বদলে হুইসেলব্লোয়ার হিসেবে সুরক্ষা দেওয়া উচিত। তার মতে, পিন্টোর প্রকাশ করা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বেনফিকার আইনজীবী রুই পাত্রিসিও আদালতে পিন্টোকে একজন ‘চোর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার বক্তব্য, পিন্টো অবৈধ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করেছেন এবং ভালো উদ্দেশ্য থাকলেও তা অপরাধকে বৈধ করে না।
ডের স্পিগেলের সাংবাদিক ক্রিস্টোফ ভিন্টারবাখ অবশ্য পিন্টোকে ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হুইসেলব্লোয়ার হিসেবে মনে করেন।
ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক অভিযোগের মামলাটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় আইনি লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। পিন্টোর ফাঁস করা নথি ও তথ্য এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
পিন্টো বর্তমানে সাক্ষী সুরক্ষার মধ্যে থেকে ম্যানচেস্টার সিটির মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে তার আইনজীবী জানিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত পিন্টোকে কীভাবে দেখা হবে, অপরাধী হ্যাকার, নাকি হুইসেলব্লোয়ার তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট। একটি কম্পিউটার থেকে শুরু হওয়া তার ‘ফুটবল লিকস’ ইউরোপীয় ফুটবলের আর্থিক ও প্রশাসনিক অন্দরমহলকে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
সূত্র: বিবিসি













