নাগরিক সংলাপ
সাইবার সুরক্ষা আইন ‘সরকার সুরক্ষা আইনে’ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা
টেকস্ক্রল নেটওয়ার্ক
প্রকাশ: ১৮:৫৫, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৫২, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
মঙ্গলবার রাজধানীর বিডিবিএল ভবনে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন বিষয়ক সংলাপে বক্তারা
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে আইনটি কার্যত ‘সরকার সুরক্ষা আইনে’ পরিণত হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীতে ‘সাইবার সুরক্ষা, না কণ্ঠরোধ? কার স্বার্থে মত প্রকাশের নতুন সীমা নির্ধারণ ও আইন সংশোধন’ শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপে তিনি একথা বলেন।
কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে ভয়েস ফর রিফর্ম, দৃক, নাগরিক কোয়ালিশন, এইচআরএসএস, জেআরএ, ডিএসএ ভিকটিম অ্যালায়েন্স ও বাংলাদেশ আমেরিকা অ্যালায়েন্স যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম। সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর।
অনুষ্ঠানে এনসিপির সদস্য সচিব এবং সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, সাইবার অপরাধ, উসকানি, নারী ও শিশুর প্রতি অনলাইন সহিংসতা এবং গুজব মোকাবিলার বিধান বিদ্যমান আইনেই রয়েছে। নতুন করে আইন সংশোধনের পরিবর্তে কারিগরি ও বিচারিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা প্রয়োজন। সংশোধনীর প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বাক্স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার অনুরোধ জানান।
সংলাপে অন্য বক্তারাও সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আইনের অপব্যবহার রোধের দাবি জানান তাঁরা।
সংলাপের শুরুতে ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর আইনটির খসড়া সংশোধনীর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হ্যাকিং, ফিশিং ও আর্থিক প্রতারণার মতো অপরাধ থেকে নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়া। তবে তাঁর অভিযোগ, আগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো এই আইনকেও ভিন্নমত পোষণকারী নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নারী ও শিশুর সুরক্ষাসংক্রান্ত বিধানগুলো সাইবার আইন থেকে সরিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ডিজিটাল অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, কোনো সরকার ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে চাইলে শুধু আইন দিয়ে তাকে ঠেকানো যায় না। তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান সরকার সেই সীমারেখার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় অনেক বছর লেগেছিল, কিন্তু বর্তমান সরকার তুলনামূলক কম সময়ে জনগণের কণ্ঠ রুদ্ধ করার পথে এগোচ্ছে।

গণভোট সরকারের কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার ঝুঁকিসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়ের প্রতি হতাশা প্রকাশ করেন মনির হায়দার।
মানবাধিকারকর্মী ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস সাইবার আইনের অধীনে সাধারণ নাগরিকদের গ্রেপ্তার ও হয়রানির কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে এই আইনে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ৬৩ শতাংশই প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা জাতীয় নেতাদের সমালোচনার কারণে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর মতে, বিদ্যমান আইনে এসব গ্রেপ্তারের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না। সরকার নতুন আইনের আওতায় গ্রেপ্তারের সুযোগ তৈরি করতে সংশোধনী আনার পরিকল্পনা করছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, খসড়া সংশোধনী নিয়ে সরকার মূলধারার গণমাধ্যমের কয়েকটি ফোরামের সঙ্গে আলোচনা করেছে। গণমাধ্যমের সুরক্ষার পাশাপাশি সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ফেসবুকে নিজের হতাশা প্রকাশ করায় ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তারকে সম্প্রতি গ্রেপ্তারের ঘটনার সমালোচনা করেন তিনি।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন দ্য ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, অল্টারনেটিভের অন্যতম সংগঠক ডা. তাজনূভা জাবীন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, নাগরিক কোয়ালিশনের অন্যতম সংগঠক হাসিব হোসেন, এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজ ইসলাম প্রমুখ।
তারা বলেন, সাইবার অপরাধ দমনের প্রয়োজন থাকলেও তা সংবিধানস্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়া উচিত নয়। আইনের অপব্যবহার রোধে সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ও জবাবদিহির বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।
সমাপনী বক্তব্যে আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপি অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তাঁর মতে, দলটি খুব দ্রুতই অবস্থান পরিবর্তন করেছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপি আর বর্তমান বিএনপি এক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ। সরকারকে অবশ্যই নাগরিকদের দাবি শুনতে হবে।













