নেপোলিয়ন-যুগের গোপন বার্তা
২১৭ বছর পর এআইয়ে ভাঙল নেপোলিয়ন-যুগের সামরিক কোড
টেকস্ক্রল নেটওয়ার্ক
প্রকাশ: ১৪:১৬, ৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৬:২৬, ৫ অক্টোবর ২০২৬
২১৭ বছর পর এআইয়ে ভাঙল নেপোলিয়ন-যুগের সামরিক কোড
দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে অপঠিত ছিল নেপোলিয়ন-যুগের একটি গোপন সামরিক বার্তা। ১৮০৯ সালে নেপোলিয়নের নির্দেশে পাঠানো ওই বার্তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় প্রায় ছয় ঘণ্টায় পাঠোদ্ধার করেছেন প্রকৌশলী কার্টার চার্চ। এতে ফরাসি ও মিত্রবাহিনীর অবস্থান, সৈন্যসংখ্যা এবং অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল।
নথিটি সরাসরি নেপোলিয়ন লেখেননি। ১৬ মার্চ ১৮০৯ প্যারিস থেকে নেপোলিয়ন তাঁর সৎপুত্র ও ইতালির রাজপ্রতিনিধি ইউজিন দ্য বোহর্নেকে জেনারেল অগাস্ট দ্য মারমন্টের কাছে সংকেত লিপিতে চিঠি পাঠানোর নির্দেশ দেন। সে সময় মারমন্ট ডালমাটিয়ায় প্রায় ১৩ হাজার ফরাসি সেনার দায়িত্বে ছিলেন এবং অস্ট্রীয় ভূখণ্ডের কারণে তাঁর বাহিনী অন্য ফরাসি বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল।
চিঠিটির প্রথম লাইন ছিল সাধারণ ফরাসি ভাষায়। এরপরের ২৪টি লাইনে ছিল সংখ্যা, অক্ষর ও হাতে আঁকা বিভিন্ন প্রতীক। পুরো সংকেত লিপিতে ছিল এক হাজার ৩০০টি সংকেত একক ও ১৫৫টি স্বতন্ত্র চিহ্ন। এটি ছিল সমধ্বনি-সংকেত লিপি, যেখানে একই অক্ষরের জন্য একাধিক প্রতীক ব্যবহার করা হতো। ফলে শুধু অক্ষর ব্যবহারের হার বিশ্লেষণ করে এটি ভাঙা কঠিন ছিল।
১৯৬৯ সালে ফরাসি সেনাবাহিনীর জার্নাল রেভ্যু হিস্তোরিক দেজ আর্মে-এ নথিটির একটি প্রতিলিপি প্রকাশিত হয়, তবে সেখানে ভুল তারিখ দেওয়া ছিল। চার্চ সেই এক হাজার ২০২ থেকে এক হাজার ৮৩৬ পিক্সেলের ছবি ব্যবহার করেন। এর আগে সংকেত লিপি-বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল এর তালিকায় ৩৩টি অক্ষরের মান জানা ছিল, যা এক হাজার ৩০০ সংকেতের ৪৩৫টির অর্থ বুঝতে সাহায্য করে। বাকি ৮৬৫টি সংকেত নথি থেকেই বের করতে হয়।
চার্চের বর্ণনা অনুযায়ী, জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা প্রথমে ছবিটিকে সারিতে ভাগ করে প্রতিটি চিহ্ন শনাক্ত করে। এ সময় হাতে আঁকা প্রায় ১৭৫টি প্রাথমিক চিহ্ন বা লেবেল থেকে কোনগুলো একই চিহ্নের ভিন্ন রূপ, তা নির্ধারণ করা হয়। পরে পরিচিত ৩৩টি মান, ফরাসি ভাষার ধরন ও কম্পিউটারভিত্তিক অনুসন্ধান ব্যবহার করে সংকেত লিপি সমাধান করা হয়। গবেষণার এক পর্যায়ে ২৯টি চিহ্নকে পুরো শব্দের সংকেত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। প্রতিটি প্রস্তাবিত মান মূল ছবির সব জায়গায় মিলিয়ে দেখা হয়।
পাঠোদ্ধার করা বার্তায় ফরাসি ও মিত্রবাহিনীর সাতটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। ডানজিগের ডিউকের নেতৃত্বে ৪০ হাজার বাভারিয়ান মিউনিখ ও পাসাউয়ে, পোনিয়াতোভস্কির নেতৃত্বে ৩০ হাজার পোলিশ সেনা ভিস্তুলা নদীর তীরে এবং স্যাক্সন বাহিনী ড্রেসডেনের সামনে ছিল। অরস্টেডের ডিউকের অধীনে ৮০ হাজার ফরাসি সেনা বেইরয়থে, রিভোলির ডিউকের অধীনে ৬০ হাজার সেনা উলম ও ডোনাউভ্যার্থে এবং ওদিনোর নেতৃত্বে ৪০ হাজারের এলিট বাহিনী অগসবুর্গ ও লেক নদীর তীরে ছিল।
বার্তায় রুশ বাহিনী অস্ট্রিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং ফ্রিউলি অঞ্চলে ৮০ হাজার ফরাসি সেনার কথা বলা হয়। তবে চার্চের বিশ্লেষণে দেখা যায়, রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রার তথ্যটি মূলত নেপোলিয়নের প্রচারণার অংশ ছিল। বাস্তবে রুশ বাহিনী জুনে গ্যালিসিয়ায় প্রবেশ করে। একইভাবে পোনিয়াতোভস্কির বাহিনী ৩০ হাজার বলা হলেও বাস্তবে ছিল প্রায় ১৭ হাজার। অন্যদিকে অস্ট্রীয় বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে বার্তার তথ্য বেশ নির্ভুল ছিল।
পাঠোদ্ধারের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয় নেপোলিয়নের ১৬ মার্চের মূল নির্দেশের সঙ্গে তুলনা করলে। সেখানে মারমন্টকে জানাতে বলা সাতটি সামরিক অবস্থান ও সৈন্যসংখ্যা নতুন উদ্ধার করা বার্তার সঙ্গে একই ক্রমে মিলে যায়। অর্থাৎ এটি নেপোলিয়নের নিজের লেখা চিঠি নয়; ইউজিনের দপ্তর থেকে পাঠানো বার্তাটি ছিল তাঁর মূল নির্দেশের বাস্তবায়ন।
চার্চের মতে, সংকেতলিপিটি নিজে খুব জটিল ছিল না; পর্যাপ্ত সময় পেলে মানব সংকেত-বিশেষজ্ঞরাও এটি ভাঙতে পারতেন। মূল চ্যালেঞ্জ ছিল পুরোনো নথির প্রতিলিপি তৈরি, প্রতীক শ্রেণিবিন্যাস, ভাষা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ। এআই এসব ধাপকে একত্র করে কয়েক ঘণ্টায় কাজটি সম্পন্ন করেছে। তবে পাঁচটি চিহ্নের অর্থ এখনো অনিশ্চিত; বিকল্প পাঠগুলো বার্তার মূল অর্থ বদলায় না। গবেষক সাতোশি তোমোকিয়ো সমাধানটি পর্যালোচনা করেছেন।
তথ্যসূত্র: ইউরোনিউজ, ডেইলি মেইল













