বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

| ৫ কার্তিক ১৪৩৩

ইউনিসেফের রিপোর্ট

২১ দেশে ২ কোটি শিশু অনলাইন নির্যাতনের শিকার

টেকস্ক্রল নেটওয়ার্ক

প্রকাশ: ১৫:০৭, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৫:১৩, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২১ দেশে ২ কোটি শিশু অনলাইন নির্যাতনের শিকার

২১ দেশে ২ কোটি শিশু অনলাইন নির্যাতনের শিকার

বিশ্বজুড়ে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটির নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১টি দেশে এক বছরে প্রায় ২ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশু প্রযুক্তির মাধ্যমে যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হয়েছেন। আক্রান্তদের বড় অংশের ঘটনা ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ওপর চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি পাঁচজনের প্রায় একজন অন্তত এক ধরনের অনলাইন যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হয়েছেন। গবেষণাটি আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শিশুদের নিয়ে করা হয়েছে।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ শিশু অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে। প্রায় ৯০ লাখ শিশুকে যৌন কথোপকথন বা যৌন ছবি পাঠাতে চাপ দেওয়া হয়েছে। আরও প্রায় ৪০ লাখ শিশুর যৌন ছবি তাদের অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি, কারণ অধিকাংশ ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না।

এছাড়া প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিশুদের ওপর প্রযুক্তিনির্ভর যৌন নির্যাতনের প্রায় ৬০ শতাংশ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে এসব ঘটনা বেশি পাওয়া গেছে। আরও ১৪ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে অনলাইন গেমিংয়ের মাধ্যমে।

দেশভেদেও চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। মন্টেনেগ্রোতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ঘটনাগুলোর ৮০ শতাংশের বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটেছে। কলম্বিয়াতেও অর্ধেকের বেশি ঘটনা এই মাধ্যমগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, শিশুদের সুরক্ষায় তারা বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে। মেটা জানিয়েছে, কিশোরদের জন্য ব্যক্তিগত হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু করা এবং অপরিচিত প্রাপ্তবয়স্কদের তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ঠেকানোর মতো সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, হোয়াটসঅ্যাপকে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, ব্যক্তিগত বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে দেখে।

স্ন্যাপচ্যাট জানিয়েছে, যৌন হয়রানি ও অনলাইন যৌন ব্ল্যাকমেইল ঠেকাতে তারা সক্রিয়ভাবে সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত, হিসাব বন্ধ এবং অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

টিকটকও জানিয়েছে, ১৮ বছরের নিচের ব্যবহারকারীদের হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যক্তিগত রাখা এবং সম্ভাব্য অপরাধী আচরণ শনাক্তে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

অনলাইনে শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে অপরাধী অপরিচিত কেউ, এমন ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে প্রতিবেদনটি। জরিপে ৫৭ শতাংশ ঘটনায় শিশুটি আগে থেকেই অপরাধীকে চিনত। তাদের মধ্যে বন্ধু, সহপাঠী, প্রেমের সম্পর্কের ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যও ছিল। অন্যদিকে ৩৮ শতাংশ শিশু প্রথমবার অপরাধীর সঙ্গে অনলাইনে পরিচিত হয়।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, অনলাইনে নির্যাতনের এসব অভিজ্ঞতা শিশুদের গভীর মানসিক কষ্টের মধ্যে ফেলে। অনেক শিশু কোথায় সাহায্য চাইবে তা না জানায় নীরবে কষ্ট সহ্য করে। শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—সব পক্ষকেই আরও দায়িত্ব নিতে হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নির্যাতনের শিকার শিশুরা খুব কমই বিষয়টি জানায়। ৪০ শতাংশের বেশি ঘটনা কোনো ব্যক্তির কাছেই প্রকাশ করা হয়নি। আর পুলিশ, সমাজকর্মী বা সহায়তা কেন্দ্রে জানানো হয়েছে ১ শতাংশেরও কম ঘটনা।

শিশুরা কেন চুপ থাকে, তার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে; কোথায় গেলে বা কাকে জানালে সাহায্য পাওয়া যাবে, তা না জানা। আর্মেনিয়ায় অর্ধেকের বেশি ঘটনাই কারও কাছে প্রকাশ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের সাক্ষাৎকারে ভয়, লজ্জা, বিভ্রান্তি ও একাকিত্বের অনুভূতি বারবার উঠে এসেছে। অনেক শিশু কী ঘটেছে তা বুঝতে এবং কোথায় সাহায্য চাইবে তা ঠিক করতেও সমস্যায় পড়েছে।

অনলাইনে যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গুরুতর প্রভাব পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব শিশুর আত্মহত্যার চিন্তা বা নিজের ক্ষতি করার ঝুঁকি অন্য শিশুদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। তাদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

কিছু দেশে ঝুঁকি আরও বেশি। মেক্সিকো ও উত্তর মেসিডোনিয়ায় নির্যাতনের শিকার শিশুদের আত্মহত্যার চিন্তা বা আচরণের ঝুঁকি আট গুণের বেশি ছিল। পাকিস্তানে নিজের ক্ষতি করার ঝুঁকি ছিল সাত গুণেরও বেশি।

প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। নয়টি দেশে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ১১ লাখ শিশু জানিয়েছে, তাদের ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে যৌন ছবি বা ভিডিও তৈরি করা হয়েছে।

প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে এ ধরনের কৃত্রিম ছবি ও ভিডিও তৈরির ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে ইউনিসেফ। তাই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নয়, নতুন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর নির্যাতন মোকাবিলায় আইন ও সুরক্ষা ব্যবস্থাও আধুনিক করার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।

ইউনিসেফের ‘থ্রু চিলড্রেনস আইজ: হাউ ডিজিটাল টেকনোলজিস এনেবল চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে প্রায় ২১ হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর তথ্য নেওয়া হয়েছে। তাদের বয়স ছিল ১২ থেকে ১৭ বছর। পাশাপাশি শৈশবে নির্যাতনের শিকার হওয়া ১০০ তরুণের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

গবেষণার প্রথম ধাপে ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে কম্বোডিয়া, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, মোজাম্বিক, নামিবিয়া, ফিলিপাইন, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা ও ভিয়েতনামে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আর্মেনিয়া, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র, মেক্সিকো, মন্টেনেগ্রো, উত্তর মেসিডোনিয়া, পাকিস্তান ও সার্বিয়ায় গবেষণা চালানো হয়।

গবেষণাটি ইউনিসেফের ‘ডিসরাপ্টিং হার্ম’ প্রকল্পের অংশ। এতে ইউনিসেফের সঙ্গে কাজ করেছে ইসিপ্যাট ইন্টারন্যাশনাল ও ইন্টারপোল। তবে জরিপে শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই ফলাফল সব শিশুর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়, বিশেষ করে যেসব দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার কম।

শিশুদের সুরক্ষায় সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি বলেছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে শুরু থেকেই শিশুদের জন্য নিরাপদভাবে তৈরি করতে হবে।

শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা বাড়ানো, অপরিচিত প্রাপ্তবয়স্কদের যোগাযোগ সীমিত করা এবং ক্ষতিকর আচরণ দ্রুত শনাক্ত ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা উন্নত করার ওপর জোর দিয়েছে তারা।

একই সঙ্গে যৌন ব্ল্যাকমেইল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি যৌন নির্যাতনের উপকরণসহ নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় আইন ও জবাবদিহি জোরদারের কথা বলেছে ইউনিসেফ।

শিশুদের জন্য বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ ও সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পরিবার, স্কুল ও সমাজকে আরও কার্যকরভাবে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।

 

সূত্র: ইউনিসেফ ও রয়র্টাস

এ সম্পর্কিত খবর
আরও পড়ুন