রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬

| ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

চীনা প্রযুক্তি বিকল্পের আশা

চীনা প্রযুক্তির নির্ভরতা কমাতে চাপে মার্কিন ব্যবসায়ীরা

টেকস্ক্রল নেটওয়ার্ক

প্রকাশ: ১৭:৫০, ৩ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৮:৩২, ৩ অক্টোবর ২০২৬

চীনা প্রযুক্তির নির্ভরতা কমাতে চাপে মার্কিন ব্যবসায়ীরা

চীনা প্রযুক্তির নির্ভরতা কমাতে চাপে মার্কিন ব্যবসায়ীরা

যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে রোবোটিক্স স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠার সাত বছর পর চীনের সহায়তা ছাড়াই রোবট তৈরি করছেন রাজাত ভাগেরিয়া। এতে পড়তে হচ্ছে চ্যালেঞ্জেও। দেশটির অধিকাংশ রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠানের মতোই শেফ রোবোটিক্স (Chef Robotics) তাদের রোবট-আর্ম বা যান্ত্রিক বাহু তৈরির জন্য চীনা যন্ত্রাংশের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো খাবার প্রস্তুতের ক্ষেত্রে রোবট-আর্মগুলো ব্যবহার করে থাকে। এদিকে স্বল্পমূল্যে বিপুল যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সক্ষমতার কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতামূলক প্রযুক্তি পণ্যের এক অপরিহার্য উৎস চীন।ভাগেরিয়া বলেন, আগে সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত মানের কাঁচামাল কেনা হতো। তবে চীনা প্রযুক্তি থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার পথটি সহজ নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র হতে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বিতা চীনা প্রযুক্তি পণ্যের ওপর নির্ভশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে গ্রাহক ও সরকারি পর্যায়ের সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করার বিষয়টিকেও সামনে আনছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন যে, এই বিধিনিষেধে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রে। চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হওয়া আশঙ্কা রয়েছে।

ভাগেরিয়ার রোবটিক বাহুতে ব্যবহৃত উপাদান এখনো নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েনি। তাই আগেভাগেই বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজছেন তিনি। শেফ রোবোটিক্সের রোবটের চূড়ান্ত সংযোজন যুক্তরাষ্ট্রে হলেও বাহুর প্রান্তে ব্যবহৃত গ্রিপারসহ উপাদানগুলো চীনে তৈরি।

গত বছর চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ার পণ্য আমদানিতে বিকল্প পথ খুঁজেন তিনি। কিন্তু প্লাস্টিকের গ্রিপার তৈরি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং চীনের বাইরে অনেক সরবরাহকারীর প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নেই বলে চ্যালেঞ্জে পড়েন তিনি।

তিনি বলেন, প্রক্রিয়াটি আমরা শুরুতে যতটা সহজ হবে বলে আশা করেছিলাম, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। কিছু প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কষ্টসাধ্য বলেও জানান উৎপাদনকারীরা।

জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) পাওয়ার ইনভার্টার এবং উন্নত রোবোটিক ডিভাইস হিউম্যানয়েড ও চার পায়ের রোবটসহ বিদেশে তৈরি সীমাবদ্ধ প্রযুক্তির তালিকায় যুক্ত করে। একই সময়ে চীনা সফটওয়্যার ব্যবহার করা গাড়ি এবং চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপরও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও শুল্ক আরোপ করেছে। ড্রোনের ক্ষেত্রেও শুল্ক ও নতুন মডেল নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এই পরিবর্তনের চাপে পড়েছে ফোর্ডের মতো মার্কিন বড় কোম্পানিও। চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি নির্মাতা সিএটিএলের ব্যাটারি ব্যবহারের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনার মুখে পড়লেও ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ড্রোনের জন্য অপটিক্যাল উপাদান তৈরি করা কোপিন করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী মাইকেল মারে জানান, চীন থেকে সরিয়ে কিছু মাইক্রোডিসপ্লে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনে দুই বছরের বেশি সময় লেগেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এসব কাঁচামাল তৈরির ব্যয় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। উৎপাদনের পরিমাণ কম হওয়ায় খরচ কমানোও কঠিন বলে জানান তিনি।

মারে বলেন, উৎপাদন কম হওয়ায় ব্যয় কমানো সম্ভব নয়। এখানে দামের ওপর চাপ রয়েছে, যা আমাদের সামলাতে হচ্ছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এক বছরে যত মাইক্রোডিসপ্লে তৈরি করতে পারে, চীন এক সপ্তাহেই তার চেয়ে বেশি উৎপাদন করতে পারে।

শিল্প ও সামরিক কাজে ব্যবহৃত রোবট কুকুর তৈরি করা প্রতিষ্ঠান ঘোস্ট রোবোটিক্সের প্রধান গ্যাভিন কেনালি চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিরল মৃত্তিকা ধাতুর নতুন উৎস খুঁজছেন। প্রতিষ্ঠানটি মোটর উৎপাদন চীন থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় সরালেও নিওডিমিয়াম চুম্বকের কাঁচামাল এখনো চীন থেকে আসে। ফলে জানুয়ারি থেকে সেটি সরকারি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে।

কেনালি বলেন, স্বল্পমেয়াদে এটি সমাধান করা অত্যন্ত কঠিন। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে এসব নিষেধাজ্ঞা দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রভাব তৈরি করতে পারে।

তবে বিশ্লেষক ও শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, চীনের বিস্তৃত সরবরাহ ব্যবস্থার প্রবেশাধিকার কমে গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স ও প্রচলিত উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রোবটস ফর আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা সামান ফারিদ বলেন, একটি মার্কিন কোম্পানি যে সময়ে তাদের প্রথম প্রোটোটাইপ তৈরি করবে, একই সময়ে চীনা কোম্পানি হয়তো ইতিমধ্যে তৃতীয় সংস্করণে পৌঁছে যাবে।

ফারিদের মতে, বিকল্প দ্রুত তৈরি করা না গেলে মার্কিন ব্যবসাগুলোর জন্য এটি বড় বাধা হতে পারে। একইভাবে চীনে সস্তায় তৈরি হিউম্যানয়েড রোবট না পেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারগুলোকে পুরোনো বা বেশি ব্যয়বহুল মডেলের দিকে যেতে হতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আর্বানা-শ্যাম্পেইনের অধ্যাপক সায়ান মিত্র বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি কোর্সে চীনের তৈরি রোবটিক বাহু, ড্রোন, হিউম্যানয়েড ও যানবাহন ব্যবহার করা হয়। চীনা হিউম্যানয়েডের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি মডেল ব্যবহার করতে গেলে ব্যয় ১০ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে ড্রোনের ক্ষেত্রে বিকল্প নাও থাকতে পারে।

এমনকি রোবট ভ্যাকুয়াম, পুল পরিষ্কার করার যন্ত্র ও লন কাটার যন্ত্রের মতো স্বয়ংক্রিয় গৃহস্থালি পণ্যের নতুন সংস্করণও এফসিসির মোবাইল রোবট নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে। এসব পণ্যের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠই চীনে তৈরি।

প্রযুক্তি-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসির কনজিউমার ডিভাইসেস রিসার্চের পরিচালক জিতেশ উবরানি বলেন, “উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। দীর্ঘমেয়াদে অবশ্য এটি সম্ভব হতে পারে। তবে এর খরচ সম্ভবত অনেক বেশি হবে, ফলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদেরই অনেক বেশি অর্থ দিতে হবে।”

চীনা প্রযুক্তিনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রে এখন দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তনে বাড়তি খরচ, দীর্ঘ সময় এবং উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র : সিএনএন

এ সম্পর্কিত খবর
আরও পড়ুন